
শুক্রবার ● ২১ মার্চ ২০২৫
প্রথম পাতা » উপ সম্পাদকীয় » চব্বিশ ও পঁচিশের ইফতার রাজনীতি
চব্বিশ ও পঁচিশের ইফতার রাজনীতি
মুহাম্মাদ আবদুল কাহহার সিদ্দিকী :: রমাদানে কুরআন-সুন্নাহ অনুসরনের মধ্য দিয়ে তাকওয়া অর্জিত হয়। রমাদান আসলে কিছু কিছু পরিভাষার সাথে আমরা পরিচিত হই। যেমন- সাহরী, ইফতার, তারাবীহ, কিয়ামুল্লাইল, ইতিকাফ, ফিতরা, সাদাকাতুল ফিতর, যাকাত ইত্যাদি। রোজা পালন করলে যেমন সাওয়াব, তেমনি কাউকে ইফতার করালেও সমান সাওয়াব। গোটা বিশ্বব্যাপী মুসলিম দেশ সমুহে ইফতার সংস্কৃতির চর্চা থাকলেও ব্যতিক্রম ছিল ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকার। বিগত বছরগুলোতে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকার মন্ত্রিসভার বৈঠকে ইফতার পার্টি না করার জন্য নির্দেশনা প্রদান করেছিল। মন্ত্রিসভার পাশাপাশি দল হিসেবে আওয়ামী লীগও ইফতার পার্টি বন্ধ রেখেছিল। সর্বশেষ ২০২৪ সালেও সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্মিলিত ইফতার না করতে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিল। গণ-ইফতার থেকে গণ-গ্রেপ্তার করা হতো। ইফতার মাহফিলকে নিছক রাজনৈতিক কর্মসুচী বলে অপপ্রচার করতো। গণ ইফতার কর্মসূচীকে মৌলবাদী ও জামাত শিবিরের কার্যক্রম আখ্যা দিয়ে হামলা চালাতো ছাত্রলীগ। ইফতার মাহফিলের মত একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাতকে বন্ধ করে তারা ইসলামের বিরুদ্ধে অবস্থান করেছিল। বিরোধী দলগুলোর সব ধরণের মত প্রকাশের স্বাধীনতা তারা খর্ব করেছিল। তাদের ইসলাম বিদ্বেষী হীন-এ কর্মকান্ডের বিপরীতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবিরসহ ইসলামী দলগুলোর পাশাপাশি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলও সেই গণ বিজ্ঞপ্তির প্রতিবাদ জানিয়েছিল।
২৪ এর জুলাই বিপ্লবের পর আওয়ামীলীগের স্বৈরতান্ত্রীক অবস্থা থেকে দেশের মানুষ মুক্তি পেয়েছে। শিশু থেকে বৃদ্ধ সবার মনে এক নতুন বাংলাদেশের আমেজ। নেতিবাচক সব নিষেধাজ্ঞা বাতিল হয়েছে। ইফতারের ভিন্নচিত দেখা গেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। শান্তি ও স্বস্তির ছোয়া দেখা গেছে সেখানে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আনন্দের সাথে ইফতার মাহফিলসহ ভাল ভাল আয়োজন করছে। এ যেন এক স্বপ্নের মত নতুন রাজ্য। বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ও রোজাদারদেরকে ইফতার বিতরণ করছে, ফ্রী মেডিকেল ক্যাম্প চালু করে সেবা প্রদান করছে। রমাদানের বাইরেও তাদের নানা আয়োজন ছিল। যখনই সুযোগ পেয়েছে শিক্ষার্থীদের পাশে থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। ভর্তি পরীক্ষা উপলক্ষ্যে প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা, অভিভাবকদের জন্য নিরাপদ বসার স্থান, মেডিকেল টিম, পর্যাপ্ত পানি ও কলমসহ বিভিন্ন সেবা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় অবস্থান নিয়ে সহায়তা করতে আমরা দেখেছি। সব ধর্মের শিক্ষার্থীদের কল্যাণে তারা কাজ করতে চায়। ইসলামী ছাত্র শিবিরের পাশাপাশি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলও এ রমাদানে হিফজুল কোরআন ও কোরআন তিলাওয়াত ও ইসলামীক গান নিয়ে প্রতিযোগিতার আয়োজন করছে। নি:সন্দেহে এসব কিছু প্রসংশনীয়। দল-মত নির্বিশেষে সম্প্রীতি বজায় রেখে সবাই ক্যাম্পাস তথা দেশের সার্বিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে এটাই তো হওয়ার কথা ছিল। অথচ বিগত সরকারের আমলে এমন সব ভালো ভালো কাজ করতে দেয়া হয়নি। ছাত্র সংগঠনগুলোর কাছে আমাদের প্রত্যাশা তারা যেন শিক্ষা ও সেবামূলক নানা কার্যক্রম অব্যাহত রাখেন।
ইফতার করানো শুধু ইবাদতই নয় এর দ্বারা সামাজিক সম্পর্ক জোড়দার হয়। এর মাধ্যমে পারিবারিক, সামাজিক ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি সুসংহত হয়। সামাজিক বিনিময়ের সুযোগ তৈরি হয়। ইফতারের সময় প্রার্থনা ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আয়োজন থাকে। পরিবারের অভিভাবকরা এ সময় শিশু ও যুবকদের ধর্মীয় জ্ঞান ও সামাজিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে উপদেশ দেন। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের শুরুতে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো ইফতারকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ ঘোষণা করে। অমুসলিম দেশগুলোতেও আয়োজন করা হচ্ছে উন্মুক্ত ইফতার মাহফিল। মুসলিম রাষ্ট্রদূতদের সম্মানে অমুসলিম দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের ইফতার আয়োজন হয়ে থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও আর্জেন্টেনিয়ায় প্রতিদিন ঘটা করে হচ্ছে রমজানের ইফতার। মার্কিন যুক্ত রাষ্ট্রের হোয়াইট হাউসে মুসলমানদের সম্মানে ইফতার আয়োজন হয়, তাদের এই সম্মান ১৫০ কোটিরও বেশী মুসলিমদের মনে আশার সঞ্চার করে। উন্মুক্ত এ আয়োজনে অংশ নিচ্ছেন মুসলমানদের পাশাপাশি অমুসলিমরাও। ইফতার এখন শুধুমাত্র ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানই নয়, বরং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। রমজানের এই ইফতার পরিণত হয়েছে মুসলিম ও অমুসলিমদের মধ্যে সৌহার্দ্য আর সহাবস্থানের অনন্য প্রতীক। আর্জেন্টিনার মুসলিম ও অমুসলিমরা রমজানকে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনার সঙ্গে স্বাগত জানায়। দক্ষিণ আমেরিকার সবচেয়ে বড় ইসলামিক সেন্টার ‘বাদশাহ ফাহাদ ইসলামিক কালচারাল সেন্টার’ সেখানেও বহুমুখী কার্যক্রম গ্রহণ করে থাকে। যেমন ইফতার ও সাহরির আয়োজন করা, মুসলিম ও অমুসলিম সব ধর্মাবলম্বীর জন্য তা উন্মুক্ত রাখা, কোরআনের পাঠদান, হিফজুল কোরআন, কিরাত ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করা। এসব পর্যালোচনা থেকে মনে হচ্ছে, বিদেশীদের অবদানের তুলনায় আমাদের দেশীয় আয়োজন অপ্রতুল। ইফতারের প্রভাব সুদূর প্রসারী হলেও ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকার তা অস্বীকার করতো।
ইফতার মাহফিলের নামে শুধুই দুনিয়াবি ফায়দা বা নিছক রাজনৈতিক বক্তৃতা, রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন ও দলীয় কর্মসূচি ঘোষণা, অসত্য বক্তব্য ও উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান, অপরকে খাটো করে কথা বলার মানসিকতায় পূর্ণ কথা বার্তা, গিবত, মিথ্যা গল্প তৈরি, নিজ থেকে বানিয়ে বানিয়ে বলার অপসংস্কৃতিও অবশ্যই বর্জনীয়। ইফতার পার্টির নামে ভূরিভোজ সমাজে চালু রয়েছে, তাতে অধিক পরিমাণে খাদ্যের অপচয় হয়। অভিজাত এলাকায় অহরহ খাবার অপচয় করা হয়। খাবার অপচয় করা যেন ফ্যাশনে রূপ নিয়েছে। খাদ্য অপচয় রোধে নৈতিকবোধ যত দিনে জাগ্রত না হবে ততদিনে সামগ্রিকভাবে ক্ষুধা ও দারিদ্রতা থেকে মুক্তি মিলবে না। সিয়াম সাধনার মাধ্যমে সংযমী হওয়ার পরিবর্তে আমরা অহংকারী আচরণ করছি। প্রতিপক্ষের আয়োজন কেমন ছিলো তা বিবেচনায় নিয়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে আমরা মরিয়া হয়ে উঠছি। সমাজের সুবিধা বঞ্চিত মানুষেরা প্রতি নিয়ত না খেয়ে মরছে, সঠিকভাবে খাবার পায় না, এমনটি যেন না হয়। সুবিধা বঞ্চিত মানুষের কাছে আগে সেবা দেয়ার চেষ্টা করতে হবে। আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধব, সহকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষকে নিয়ে ইফতার মাহফিল আয়োজন করে ইসলামী আলোচনার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে সেই কার্যক্রমকে আরো শক্তিশালী করা ঈমানের দাবী। পরিবারের ইফতার, মসজিদে মসজিদে ইফতারের আয়োজন, রাজনৈতিক দলের ইফতার পার্টি, মাদ্রাসায় ইফতার আয়োজন, চলন্ত পথে গাড়ির যাত্রীদের মাঝে ইফতার বিতরণ, ফুটপাতে ইফতার সাজিয়ে রেখে আনন্দ ভাগাভাগি করা মুসলিমদের জন্য বড় একটি অর্জন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) এ বিষয়ে উৎসাহ দিয়ে বলেন, যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে সে ওই রোজাদারের সমপরিমাণ সওয়াব পাবে। আর রোজাদারের সওয়াবও কমানো হবে না। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ৮০৭) রাসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে পানি পান করাবে আল্লাহ তাকে হাউসে কাওসার থেকে এমন পানি পান করাবেন, যারপর জান্নাতে প্রবেশ করা পর্যন্ত আর পিপাসা লাগবে না।’ (বায়হাকি, ইবনে খুজায়মা)। তাই নিজেদের ইফতারি পরস্পর ভাগাভাগি করে খাওয়ার মধ্য দিয়ে, অপর ভাইকে ইফতারে শামিল করে চরম তৃপ্তি, অধিক পূণ্য ও কল্যাণ অর্জন করা যায়। তাই সহিহ নিয়ত নিয়ে ইফতার মাহফিলের আয়োজন বেশি বেশি করা উচিত। ধর্মীয় দৃষ্টিতে ইফতার গ্রহণের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ইফতার পূর্ব মুহূর্ত একটি বরকতময় সময়। সাওমপালনকারী ইফতারের আগে কুরআন তিলাওয়াত, যিকির-আযকার, দান-খয়রাত, দুয়া-মুনাজাত ছাড়াও অন্যান্য নফল ইবাদাত আদায় করার মধ্য দিয়ে সময়টি অতিবাহিত করেন। কেউ আবার নিজ হাতে ইফতার তৈরি করে থাকেন। রোজাদারের জন্য সূর্যাস্তের পর দ্রত ইফতার করা সুন্নত। ইফতার না করা বা তা করতে বিলম্ব করা সুন্নতপরিপন্থী। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, মানুষ যত দিন দ্রত ইফতার করবে, তত দিন তারা কল্যাণের ওপর থাকবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৯৫৭) ইফতারের সময় আল্লাহ রোজাদারের দোয়া কবুল করেন। মহানবী (সা.) বলেন, তিন ব্যক্তির দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না : ন্যায়পরায়ণ শাসক, রোজাদার যখন সে ইফতার করে এবং অত্যাচারিত ব্যক্তির দোয়া। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১৭৫২)
সর্বপরি, জালিম সরকারের পলায়নের মধ্য দিয়ে কিছু জুলুমের অবসান হয়েছে। বাংলাদেশি জনগণের মনে স্বস্তি ফিরে এসেছে। স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে সার্বিক পরিস্থিতি। শহীদদের রক্তের বিনিময়ে সুন্দরভাবে জীবন চালাতে পারছি, রমজানকে উপভোগ করতে পারছি। আলহামদুলিল্লাহ
লেখক: শিক্ষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট
[email protected]